Found Within, Lost Without

হিরণ্য নগরের ধনবান শ্রেষ্ঠী, পিতা সামন্ত দাসের আশ্রয় ছেড়ে খুব কম বয়সেই মহামায়া বিহারের আচার্য শীলব্রতের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে ভগবান বুদ্ধের শরণ নিয়েছে সুনন্দা। কিন্তু কেন যেন শান্তি নেই তার মনে।
প্রাত্যহিক কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে পালন করলেও সে যেন সর্বদাই এক ঘোরের মধ্যে থাকে। তার সান্নিধ্যে কেউ আসতে পারে না, যেন এক অদৃশ্য বলয় সর্বদা তাকে ঘিরে রাখে। প্রশ্ন করেও সদুত্তর পান না আচার্য, এমনকি স্বয়ং শীলব্রতও।
নির্জন রাতে বিহারের অলিন্দে দাঁড়িয়ে নিদ্রাহীন কিশোরীটি কী যে ভেবে চলে, কার প্রতীক্ষায় রাতের পর রাত কাটিয়ে দেয়, তার হদিস কেউই পায় না।
কেউ যেন কবে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিল—ফিরে আসবে, আবার দেখা হবে তাদের।
প্রতীক্ষায় কেটে যায় সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। তার ‘চমকিত মন, চকিত শ্রবণ, তৃষিত ব্যাকুল আঁখি’ আশায় আশায় থাকে। মন চঞ্চল হয়ে ওঠে বনের পাখির কূজনে, পাতার মর্মরে, বিদ্যুতের চমকানিতে।
দিবাস্বপ্নে বেজে যায় বাঁশি। কে বাজায়? কোথা থেকে ভেসে আসে সে সুর! চোখ খুললেই উধাও হয়ে যায় সেই জাদুকরী বাঁশির তান, যা অজানা কোনো অরূপ মোহে সুনন্দাকে আকর্ষণ করতে থাকে।
যে রাতে ঘুম নামে তার চোখের পাতা জুড়ে, স্বপ্ন দেখে সে—
অজানা এক পাহাড়ের ওপরে…
ঘন বেতের জঙ্গল আর বাঁশবনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক অর্ধভগ্ন পাষাণ মূর্তি।
নিঝুম রাতে সেই পাহাড়ের বেতগাছ হাওয়ায় দোলে, বাঁশবনে সিরসির শব্দ তুলে বয়ে যায় মাতাল বাতাস। বেত ডাঁটার ছায়ায় পাষাণ মূর্তির মুখ ঢাকা পড়ে আছে।
সেই অন্ধকার অর্ধরাত্রে জনহীন পাহাড়ের বাঁশবনে ঝোড়ো হাওয়া ঢুকে কেবলই বাজিয়ে চলে মেঘ মল্লার।
ভোরে ঘুম ভাঙলে আশ্চর্য হয়ে ভাবে সুনন্দা—
কেন এই স্বপ্নটা তাড়া করে ফেরে তাকে? কোথায় সেই পাহাড়, বেতবন, পাথরের মূর্তি?
এ কি কেবলই অর্থহীন দুঃস্বপ্ন?
বিহার ত্যাগ
জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া আষাঢ় শুক্লপক্ষের এক গভীর রাতে সকলের নজর এড়িয়ে উত্তর খুঁজতে বিহার ত্যাগ করে সুনন্দা।
মহামায়া বিহারের তোরণদ্বারে দাঁড়িয়ে চিন্তিত আচার্য শীলব্রত।
সুনন্দাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—না বিহারে, না আশপাশের গ্রামে।
মধ্যবয়সী এই শ্রমণ প্রব্রজ্যা স্তর পার করে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুতে পরিণত হয়েছেন। উপসম্পদা লাভের পর মহামায়া বিহারের অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন কম বয়সেই।
রাজগৃহের বৈপুল্লগিরির ওপর থেকে ধীর গতিতে নামছিলেন এক বৃদ্ধ বৌদ্ধ ভিক্ষু।
পাহাড় সুকঠিন প্রস্তরময়, শ্যামলিমার অভাব দৃষ্টিকে পীড়া দেয় অথচ তার সানুদেশ সবুজের ভারে ভারাক্রান্ত।
বসুমিত্রের আগমন
পরম রমণীয় প্রকৃতি আকর্ষণ করল আচার্য বসুমিত্রকে।
রাজগৃহ নগরের তোরণদ্বার পার করেই নজরে এলো গাছপালায় ঘেরা এক প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার—
আম, জাম, কাঁঠাল গাছে পূর্ণ, সামনে পরিষ্কার নিকোনো আঙিনা, পিছনে কালো মেঘের ছায়ায় ঢাকা এক পদ্মপুকুর।
দু’দিন হয়ে গিয়েছে, আচার্যের জন্য অপেক্ষা করছে সুনন্দা।
দূর থেকে ভিক্ষুকে বিহারের দিকে আসতে দেখেই উঠে দাঁড়াল মেয়েটি।
সূর্যাস্তের রোদ এসে তার শ্যামল মুখটিকে করে তুলেছে অনিন্দ্য সুন্দর।
সুনন্দার চোখ তুলে তাকানো মাত্র আচার্য বসুমিত্র সেই কোমল, নিষ্পাপ চোখ দুটিতে চোখ রাখলেন।
আনত হয়ে ঋষি পুরুষটির পদরজ গ্রহণ করে মাথায় ছোঁয়াল সুনন্দা।
বসুমিত্রের আশীর্বাদ
“কল্যাণমস্তু!”
শীর্ণ হাত দু’টি বাড়িয়ে তার মস্তক স্পর্শ করলেন ভিক্ষু।
এক অদৃশ্য শীতল তরঙ্গ সঞ্চালনে কেঁপে উঠল সুনন্দার দেহবল্লরী।
দূরবর্তী কোনো এক পর্বতশিখর থেকে এক জলপ্রবাহ এসে যেন জুড়িয়ে দিল তার তপ্ত শরীর।
প্রদ্যুম্নর সন্ধান
নৈশাহার সম্পন্ন হলে সুনন্দার ডাক পড়ল আচার্যের পাঠকক্ষে।
“বল মা, কী তোমার সমস্যা!”
সুনন্দার চোখে ভেসে উঠল স্বপ্নালু চোখ ও কোমল দাড়িগোঁফে ঘেরা প্রদ্যুম্নর উজ্জ্বল রূপ—
তার স্বপ্নপুরুষ, যাকে একবার ছুঁয়ে দেখতে সাধ জাগত।
প্রদ্যুম্ন হারিয়ে গেছে, আর সে তার সন্ধান পেতে এসেছে আচার্য বসুমিত্রের কাছে।
আচার্য পূর্ণবর্ধনের কাছে বার্তা পাঠালেন।
দিন কেটে যায়…
সত্যের উন্মোচন
এক রাতে আচার্য বসুমিত্র পুকুরঘাটে এসে সুনন্দাকে ডাকলেন।
“প্রদ্যুম্নকে তুমি আর কোনোদিনই দেখতে পাবে না, সুনন্দা।”
সুনন্দার চোখ ছলছল করে উঠল।
“এক ঠগ কাপালিক, গুণাঢ্যর হাতের পুতুল হয়ে অন্যায় করেছে প্রদ্যুম্ন… আর সেই পাপের প্রতিকারের পথেই সে হারিয়ে গেছে।”
সুনন্দার বুকের ভেতরে গাঢ় অভিমানের মেঘ যেন তার চোখের আগল ভেঙে নেমে এল।
“কী হয়েছে আচার্য? আমি সত্য জানতে চাই!”
আচার্য বললেন, “প্রদ্যুম্ন আজ পাথরে রূপান্তরিত হয়ে আছে সেই মন্দিরে।”
প্রদ্যুম্নর মুক্তির একমাত্র উপায়—সুনন্দার আত্মবলিদান।
সত্যের সাক্ষাৎ ও আত্মত্যাগ
এক বছর কঠোর তপস্যার পর, আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে, মন্ত্রপুত বারি নিয়ে পাহাড়চূড়ায় গুণাঢ্য উপস্থিত হলো।
সুনন্দা তপস্যার পরম সিদ্ধি লাভ করে পাথর মূর্তির ওপরে মন্ত্রপুত জল সিঞ্চন করল।
প্রদ্যুম্নর দেহে প্রাণ সঞ্চার হলো—
কিন্তু শর্তানুযায়ী, নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়ল সুনন্দার দেহ।
প্রদ্যুম্ন বুঝতে পারল তার ফিরে আসার বিনিময়ে সুনন্দা তার জীবন উৎসর্গ করেছে।
বিপন্ন কণ্ঠে সে শুধাল “কেন?”
শেষ দৃশ্য
কিন্তু কোনো উত্তর আসেনি।
শুধু বাতাসে বাঁশির সুর বয়ে চলেছে মেঘ মল্লারের…

Join the Discussion